বাংলাদেশের কৃষি উন্নয়নে বঙ্গবন্ধুর অবদান

মধুমতি নদীর কোল ঘেঁষে দক্ষিণাঞ্চলের এক অজপাড়াগাঁ গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ জন্মগ্রহণ করেন ‘খোকা নামে একটি শিশু। কালক্রমে এই খোকা হয়ে ওঠেন বাংলার মহানায়ক। তিনি আর কেউ নন। তিনি বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতির অবিস্মরণীয় মহান নেতা। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি একটি স্বাধীন দেশের প্রতিষ্ঠাতা প্রাণ পুরুষ হয়ে উঠেছিলেন, বহু ত্যাগ তিতিক্ষা আর সংগ্রামের বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে। হয়ে উঠেছিলেন গণমানুষের ভালোবাসায় সিক্ত এক দীপ্তিময় কালপুরুষ।

পঞ্চান্ন বছরের যাপিত জীবন ছিল বঙ্গবন্ধুর, যা সময়ের বিচারে সংক্ষিপ্ত-ই বলা যায়। কিন্তু জীবনের দৈর্ঘ্যরে চেয়ে তাঁর কর্মের প্রস্থ ছিল অনেক বেশি। ইংরেজিতে যাকে বলা হয়, খধৎমবৎ ঃযধহ ষরভব – অর্থাৎ জীবনের চেয়ে বড়। তিনি বাঙালির স্বাধীনতা ও রাষ্ট্র নির্মাণের কারিগর ছিলেন। এমন মানুষ যে তাঁর যাপিত জীবনের চেয়ে বড় হবেন, তা স্বীকার্য (ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন দৈনিক ভোরের কাগজ ২৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২০)।

বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ। সুজলা, সুফলা- শস্য- শ্যামলায় ভরপুর এই বাংলাদেশ। গত শতাব্দীর সত্তরের দশকে কৃষিই ছিল এদেশের অর্থনীতির প্রধান খাত। এদেশের জনসংখ্যার সিংহভাগ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কৃষির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল। এই কৃষিকে দেখে দেখেই বেড়ে উঠেছেন বঙ্গবন্ধু। খুব কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করেছেন কৃষিকে অবলম্বন করা আধপেটা-একপেটা কৃষক, আর তাদের দারিদ্র্য পীড়িত জীবন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন, কৃষির উন্নতি ছাড়া এদেশের মানুষের মুক্তি আসতে পারে না। কৃষকেরাই এদেশের প্রাণ। এদেশের কৃষক-শ্রমিক মেহনতি মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের ভাবনা বঙ্গবন্ধু আজীবন লালন করেছেন। বঙ্গবন্ধু জানতেন এদেশের কৃষক ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠী এদেশের কৃষি ও মাটির সঙ্গে সম্পৃক্ত। বঙ্গবন্ধু ছিলেন কৃষি ও কৃষিবান্ধব মানুষ। সমৃদ্ধ ও স্বনির্ভর উন্নত বাংলাদেশ এবং সোনার বাংলা গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি। সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দেশকে সুন্দরভাবে গড়ে তোলার জন্য কৃষির উন্নতির কোন বিকল্প ছিল না। তাইতো স্বাধীনতার ঊষালগ্নে কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে তিনি দেশে সবুজ বিপ্লবের ডাক দেন। শুরু হয় কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার। স্বাধীন বাংলাদেশের কৃষকদের ভাগ্যোন্নয়নে বঙ্গবন্ধু উল্লেখযাগ্য পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। যুদ্ধ বিধ্বস্ত সদ্য স্বাধীন দেশের খাদ্য ঘাটতি ছিল প্রাথমিক হিসেবে ৩০লক্ষ টন। সে সময় ছিল না ফসল আবাদ করার প্রয়োজনীয় বীজ, সার, কীটনাশক। সেচ সহ কৃষি উপকরণের ঘাটতি ছিল প্রকট। এসব কেনার তহবিলও ছিলনা সরকারের হাতে। ঘাটতি পূরণে বঙ্গবন্ধু তাৎক্ষণিক আমদানির মাধ্যমে এবং স্বল্প মেয়াদে উন্নত পদ্ধতিতে চাষাবাদ, উন্নত বীজ, সেচ ও অন্যান্য কৃষি উপকরণ সরবরাহ করে এবং কৃষি ঋণ মওকুফ, সার্টিফিকেট মামলা প্রত্যাহার ও খাসজমি বিতরণ করে কৃষিক্ষেত্র উৎপাদনশীলতা ও উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে খাদ্যে স্বনির্ভরতা অর্জনের চেষ্টা করেন।

১৯৭১ সালে দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ, সত্তরের ভয়াল ঘূর্ণিঝড় ও বাহাত্তরের দীর্ঘ অনাবৃষ্টি – সদ্য স্বাধীন দেশের খাদ্য উৎপাদন ক্ষেত্রকে করেছিল বিপর্যস্ত। নয় মাস যুদ্ধের কারণে কৃষক মাঠে ফসল ফলাতে সমস্যায় পড়ে। বহু কৃষককে ঘরবাড়ি ত্যাগ করতে হয় বলে অনেকেই চাষাবাদ করতে পারেনি। মানুষের মুখে রোজ দু’বেলা আহার জোগানো ছিল সে সময়ের এক কঠিন চ্যালেঞ্জ। বঙ্গবন্ধু ভাবতেন সবার আগে দরকার খাদ্যের। খাদ্যের নিশ্চয়তা না দিতে পারলে সব উন্নয়ন কার্যক্রম বিফলে যাবে। এ উপমহাদেশের আর এক জাতির জনক ও অসহযোগ আন্দোলনের পথিকৃৎ মহাত্মা গান্ধী বলেছিলেন, ‘একজন ক্ষুধার্ত ব্যক্তি এক টুকরো রুটির মধ্যে ¯্রষ্টাকে দেখেন।’ বঙ্গবন্ধু এই ঐতিহাসিক বাণী উপলব্ধি করে বলেছিলেন, ‘খাবার অভাব হলে মানুষের মাথা ঠিক থাকে না। সেজন্য খাওয়ার দিকে নজর দেওয়ার প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। আমাদের চেষ্টা করতে হবে অন্নহীন মানুষের মুখে অন্ন তুলে দিতে।’ রক্তক্ষয়ী মুক্তি সংগ্রামে যে দেশের এত মানুষ মরেছে, সেখানে খাদ্যের অভাবে কোন মানুষের মৃত্যুকে তিনি কোনোভাবেই মেনে নিতে চাননি।

কৃষকদের উজ্জীবিত করতে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘কোন জাতি বেশি দিন টিকে থাকতে পারে না, যদি লক্ষ লক্ষ টন খাদ্যশস্য ভিক্ষা করতে হয়, বিদেশ থেকে আনতে হয়, দুনিয়া ঘুরে চেষ্টা করেও আমি চাউল কিনতে পারছি না। চাউল পাওয়া যায় না। চাউল যদি খেতে হয় আপনাদের পয়দা করে খেতে হবে।’ বঙ্গবন্ধু মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছিলেন, এদেশের মানুষকে বাঁচাতে হলে অন্য দেশ থেকে চাল কিনে বা খাদ্য এনে বাঁচানো যাবে না। তাই তিনি দেশে খাদ্য উৎপাদন বাড়ানোর জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। খাদ্যে স্বয়ম্ভরতা অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে জাতির পিতা বলেছেন, ‘খাদ্যের জন্য অন্যের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। আমাদের নিজেদের প্রয়োজনীয় খাদ্য আমাদেরই উৎপাদন করতে হবে। আমরা কেন অন্যের কাছে খাদ্য ভিক্ষা চাইব। আমাদের উর্বর জমি, আমাদের অবারিত প্রাকৃতিক সম্পদ, আমাদের পরিশ্রমী মানুষ, আমাদের গবেষণা সম্প্রসারণ কাজে সমন্বয় করে আমরা খাদ্যে স্বয়ম্ভরতা অর্জন করব। এটা শুধু সময়ের ব্যাপার’। (ড. শামসুল আলম কৃষি ও কৃষকের বঙ্গবন্ধু জানুয়ারি, ২০২০)। বঙ্গবন্ধুর এই শ্বাশত আহবানই কৃষি বিপ্লব ও খাদ্যে স্বয়ম্বভরতা অর্জনে যুযোপযোগী ভূমিকা রেখেছিল। তাঁর দ্বিতীয় বিপ্লবের উজ্জীবনী বানী ছিল উৎপাদন বাড়াও এবং কৃষকরাই হলো এই বিপ্লবের অগ্রসৈনিক। সমবায়ের মাধ্যমে তিনি কৃষি বিপ্লবকে সফল করতে চেয়েছিলেন। কৃষি বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার জন্য তিনি উচ্চতর কৃষি শিক্ষা, গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও সম্প্রসারণের দিকে নজর দিয়েছিলেন।

কৃষক অন্তপ্রাণ বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার পর সহায়-সম্বলহীন ২২ লাখ কৃষক পরিবারকে পুনর্বাসন করেছেন। তাদের পুনর্বাসনে স্বল্প মূল্যে এবং অনেককে বিনামূল্যে বীজ, সার, কীটনাশক ও আনুষঙ্গিক কৃষি উপকরণ এবং কৃষি যন্ত্রপাতি ও সেচ সুবিধা সরবরাহের ব্যবস্থা করেন। ১৯৭২ সালে বিদ্যমান সমবায় সমিতি ছাড়াও বঙ্গবন্ধুর সরকার ১৯৭২ সালে সমন্বিত পল্লী উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় দ্বিস্তর বিশিষ্ট সমবায় ব্যবস্থা চালু করেন। ১৯৭২ সালের শেষে স্বল্পমূল্যে কৃষকদের ৪০ হাজার শক্তি চালিত লো-লিফট পাম্প, ২ হাজার ৯০০টি গভীর নলকূপ এবং ৩ হাজারটি অগভীর নলকূপ দেয়া হয়। এর ফলে ১৯৬৮-৬৯ সালের তুলনায় ১৯৭৪-৭৫ সালে সেচের জমি এক তৃতীয়াংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৩৬ লাখ একরে উন্নীত হয়।  সেচ সুবিধা সম্প্রসারণের পাশাপাশি কেবল ১৯৭২ সালে ৫০ হাজার টন সার, ১৬ হাজার ১২৫টন উচ্চফলনশীল ধান বীজ, ৪৫৪ টন পাটের বীজ, একহাজার ৭শ’ মণ আলু বীজ  এবং তিন হাজার মণ গম বীজ বিতরণ করা হয়। এছাড়া হালচাষের জন্য নামমাত্র মূল্যে একলাখ গবাদি পশু ও ভর্তুকি মূল্যে ৫০ হাজার দুগ্ধবতী গাভী সরবরাহ করা হয়। অন্যান্য কৃষি উপকরণ সরবরাহের পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালে ইউরিয়া, পটাশ ও টিএসপি সারের মণপ্রতি মূল্য নির্ধারণ করে দেন যথাক্রমে ২০টাকা, ১৫টাকা ও ১০ টাকা। সত্যিকার অর্থে বিশ্ব বাজারের এসব সারের উচ্চমূল্য যেন কৃষকদের ফসলের জমিতে সার প্রয়োগে বিঘœ সৃষ্টি করতে না পারে, সেজন্য সারে কৃষককে ভর্তুকি দেন বঙ্গবন্ধু। এসব পদক্ষেপের ফলে রাসায়নিক সারের ব্যবহার ৭০ শতাংশ, কীটনাশক ৪ শতাংশ এবং উচ্চফলনশীল বীজের ব্যবহার ২৫ শতাংশ বেড়ে যায়। এর ফলে ১৯৭৫-৭৬ সালে খাদ্য উৎপাদন ৮৭ লাখ মেট্রিক টন থেকে বেড়ে দাঁড়ায় ১ কোটি ২৩ লাখ টনে। কৃষিতে বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধিই নয় বিশেষ বরাদ্দের ব্যবস্থাও বঙ্গবন্ধু করতেন। তার নিদর্শন ১৯৭২-৭৩ সালে ৫০০ কোটি টাকা উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ ছিল। এর মধ্যে ১০১ কোটি টাকা শুধুমাত্র কৃষি উন্নয়নের জন্য তিনি রেখেছিলেন (ড. মো: এনামুল হক কৃষি ও কৃষকের ভাবনায় বঙ্গবন্ধু ফেব্রুয়ারি ২০১৯)। যা ছিল তখনকার সময়ে এক দুঃসাহসী উদ্যোগ। এতে কৃষক ও কৃষির উন্নয়নের প্রতি তাঁর আন্তরিকতা প্রকাশ পায়।

কৃষি উৎপাদনে উৎসাহ প্রদানের লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু ১৯৭৪ সাল থেকে কৃষি উন্নয়নে জাতীয় পর্যায়ে সর্বোচ্চ সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ ‘জাতীয় কৃষি পুরস্কার’ পদক চালু করেন। বঙ্গবন্ধুর সময় দেশে প্রথম কৃষি ঋণ ব্যবস্থার প্রচলন করা হয়। কৃষকরা যাতে সহজভাবে ঋণ পেতে পারে এলক্ষ্যে ১৯৭৩ সালে কৃষি ব্যাংক স্থাপন করা হয়। তিনি ১০ লাখ কৃষকের কৃষিঋণের সার্টিফিকেট মামলা প্রত্যাহার করেছিলেন এবং ভূমিহীন কৃষকদের মাঝে খাস জমি বিতরণ এবং সহজশর্তে কৃষি ঋণের ব্যবস্থা করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর সরকার ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা মওকুফ এবং পরিবার পিছু জমির সর্বোচ্চ মালিকানা সিলিং ১০০ বিঘা নির্ধারণ করে দেন। ধান, পাট, তামাক ও আখসহ গুরুত্বপূর্ণ কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তির লক্ষ্যে ন্যূনতম ন্যায্যমূল্য বেঁধে দেয়া হয়। দরিদ্র কৃষকদের রক্ষায় নি¤œমূল্যে রেশন প্রাপ্তি নিশ্চিত করা হয়। গরিব কৃষক পরিবারের সন্তান যেন সরকারি খরচে লেখাপড়া করতে পারে, সে ব্যবস্থাও করে দেয়া হয়। বঙ্গবন্ধুর সরকার সরকারিভাবে খাদ্যমজুদের জন্য ১৯৭২ সালের মধ্যে ১০০ গোডাউন নির্মাণ করে। বঙ্গবন্ধু কৃষিপণ্য রপ্তানির মাধ্যমে দেশের উন্নয়নের স্বপ্নবীজ বুনেছিলেন। তিনি পাট, চা, পশুর চামড়া, মৎস্য ও বনজ সম্পদ ইত্যাদি রপ্তানি করে অর্থনৈতিক মুক্তির প্রয়াস নিয়েছিলেন। বস্তুত এদেশের কৃষি ও কৃষক নিয়ে, বঙ্গবন্ধুর ভাবনা ছিল বিশাল-বিপুল। কৃষি উন্নয়নের জন্য নদী রক্ষা, খাল খনন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ, নতুন ফসলের চাষ পদ্ধতি, সারা বাংলাদেশ জুড়ে বৃক্ষরোপণ অভিযান, ব্রিজ-কালভার্ট নির্মাণ, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি সাধন, গ্রামে গ্রামে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেয়ার প্রতিশ্রুতি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর আধুনিকায়ন, কৃষি-মৎস্য-কুটির শিল্প, মোট কথা এমন কিছু নেই যেদিকে তিনি গুরুত্ব দেননি। একটি আধুনিক ও স্বনির্ভর দেশ গড়ে তোলার জন্য যা যা করার দরকার সবই তিনি করতে চেয়েছিলেন।

বঙ্গবন্ধু অসম্ভব রকম দূরদৃষ্টি সম্পন্ন এক নেতা ছিলেন বলে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, কৃষক ও কৃষির উন্নয়ন ছাড়া এদেশের মানুষের মুক্তি আসতে পারে না। কৃষকেরাই এদেশের প্রাণ। তাই তিনি সবসময় বলতেন, ‘আমাদের চাষিরা হলো সবচেয়ে দুঃখী ও নির্যাতিত শ্রেণি। তাদের অবস্থার উন্নতির জন্য আমাদের উদ্যোগের বিরাট অংশ অবশ্যই তাদের পেছনে নিয়োজিত করতে হবে।’ তিনি সবসময়ই বলতেন, ‘আমাদের দেশের জমি এত উর্বর যে বীজ ফেললেই গাছ হয়, গাছ হলে ফল হয়। সেদেশের মানুষ কেন ক্ষুধার জ্বালায় কষ্ট পাবে।’ তিনি মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছিলেন যে, এদেশে যেমন সোনার মাটি ও মানুষ আছে, তেমনি আছে কৃষির অপার সম্ভাবনা। এমন সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে কৃষি উন্নয়নের মাধ্যমে অর্থনীতিকে মজবুত করতে হবে।

আমাদের দেশের জমিতে বিজ্ঞানভিত্তিক চাষাবাদ করতে পারলে ফসলের ফলন যে বৃদ্ধি পাবে, এ বিষয়ে কোনো সংশয় বঙ্গবন্ধুর মনে ছিল না। ১৯৭৫ সালের ২৬ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্বাধীনতা দিবসের এক জনসভায় বঙ্গবন্ধু তাঁর বক্তৃতায় বলেছিলেন, ‘আপনারা জানেন, আমার দেশের এক একর জমিতে যে ফসল হয়, জাপানের এক একর জমিতে তার তিনগুণ ফসল হয়। কিন্তু আমার জমি দুনিয়ার সেরা জমি। আমি কেন সেই জমিতে ডাবল ফসল ফলাতে পারব না, তিনগুণ করতে পারব না? আমি যদি দ্বিগুণও করতে পারি তাহলে আমাকে খাদ্য কিনতে হবে না। আমি চাই বাংলাদেশের প্রত্যেক কৃষক ভাইয়ের কাছে; যারা সত্যিকার কাজ করে, যারা প্যান্ট পরা কাপড় পরা ভদ্রলোক, তাদের কাছেও চাই, জমিতে যেতে হবে, ডাবল ফসল করুন। প্রতিজ্ঞা করুন- আজ থেকে ওই শহীদদের কথা স্মরণ করে ডাবল ফসল করতে হবে। যদি ডাবল ফসল করতে পারি, আমাদের অভাবও ইনশাল্লাহ হবে না।’ বঙ্গবন্ধু সমন্বিত কৃষি ব্যবস্থার ওপর জোর দেন। যৌথ খামার গড়ে তোলার আহবান জানান। তিনি বলেন, ‘খাদ্য বলতে শুধু ধান, চাল, আটা, ময়দা আর ভুট্টাকে বুঝায় না বরং মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, শাকসবজি, ফলমূল এসবকে বুঝায়।’ সুতরাং কৃষির উন্নতি করতে হলে এসব খাদ্যশস্যের সমন্বিত উৎপাদনের উন্নতি করতে হবে।

বঙ্গবন্ধুর আহবানে সাড়া দিয়ে বাংলার কৃষক মাঠিভরা ধান ফলিয়েছিলেন। ধানের বাম্পার ফলন ছিল অনিবার্য। কিন্তু, সেই ফসলের হাসি তিনি আর দেখে যেতে পারেননি। তার আগেই ঘাতকরা তাঁকে চিরদিনের জন্য বাংলার মানুষের কাছ থেকে শারীরিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। জাতির বড়ই দুর্ভাগ্য বঙ্গবন্ধুর কৃষি ও কৃষকের ভাবনা তিনি বাস্তবায়ন করে যেতে পারেন নি। এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য আরও একুশ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে।

তবে, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ও ভাবনাকে ভিত্তি করে তাঁর সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা আরও বলিষ্ঠ নীতি নিয়ে এদেশের কৃষি উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। এজন্য তাঁর সরকার পরিচিতি পেয়েছে কৃষি  বান্ধব সরকার হিসেবে। তাঁর গতিশীল নেতৃত্ব ও পরিকল্পনায় দেশ আজ খাদ্যশস্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ যা বঙ্গবন্ধুরই চাওয়া ছিল। স্বাধীনতার ঠিক পরে ১৯৭২ সালে দেশে খাদ্যশস্য উৎপাদন হয় ১ কোটি ১০ লাখ টন; এর মধ্যে ধান উৎপাদন হয় মাত্র ৯৩ লাখ টন। তখন সাড়ে সাতকোটি মানুষের জন্য ওই খাদ্য পর্যাপ্ত ছিলনা। স্বাধীনতার ৪৯ বছরের ব্যবধানে আজ দেশের মানুষ বেড়ে আড়াইগুণ হয়েছে। আবাদি জমি কমেছে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ। তবে খাদ্য উৎপাদন বেড়েছে সাড়ে তিনগুণ। বর্তমানে চালের উৎপাদন প্রায় ৪ কোটি টনে উন্নীত হয়েছে। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে দানাজাতীয় খাদ্যশস্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। আলু, শাকসবজি, তেলবীজ, মসলা ও ফল উৎপাদনেও উল্লখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। এখন আমরা মাংস উৎপাদনেও স্বয়ংসম্পূর্ণ। মাছ, মুরগি, ডিম, দুধ ও গবাদিপশুর বাণিজ্যিক উৎপাদনের ক্ষেত্রেও অনেক দূর এগিয়েছে বাংলাদেশ। কৃষির নানা ক্ষেত্রে এখন অর্জিত হয়েছে অনেক সাফল্য। বাংলাদেশ এখন সারা বিশ্বে কৃষি উন্নয়নের রোল মডেল।

সাম্প্রতিক সময়ে কৃষি খাতে উন্নয়নের কারণে বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়েছে। গত পাঁচ বছরে দেশে অতি দারিদ্র্যের হার ১০ শতাংশ কমানোর ক্ষেত্রেও কৃষি উৎপাদন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে বিশ্ব ব্যাংক, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (ঋঅঙ) এবং আন্তর্জাতিক খাদ্যনীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (ইফপ্রি) বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ইফপ্রি’র ক্ষুধা নিবারণ সূচকে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে আছে বাংলাদেশ। মাত্র এক বছরেই এই সূচকে ১১ ধাপ এগিয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের কৃষি খাতে এসব সাফল্যের পেছনে বঙ্গবন্ধুর কৃষি ভাবনা মূল শক্তি হিসেবে কাজ করছে। সুতরাং বাংলাদেশের কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নে বঙ্গবন্ধুর অবদান চিরস্মরণীয়, চির অম্লান। তাই বাংলা সাহিত্যের খ্যাতিমান লেখক অন্নদাশঙ্কর রায় বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যথার্থই বলেছিলেন, ‘যতোকাল রবে পদ্মা যমুনা/ গৌরি মেঘনা বহমান / ততকাল রবে কীর্তি তোমার / শেখ মুজিবুর রহমান/ দিকে দিকে আজ অশ্রুমালা রক্তগঙ্গা বহমান/ তবু নাই ভয়ে হবে হবে জয়, জয় মুজিবুর রহমান।’

লেখক উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা উপজেলা কৃষি অফিস রূপসা, খুলনা, মোবাইল: ০১৯২৩-৫৮৭২৫৬

Related posts

Leave a Comment

CAPTCHA ImageChange Image